নড়াইলে সাম্প্রদায়িক হামলাঃ হিন্দুদের ৭০টির বেশী বাড়ি-মন্দির-দোকানপাট ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট

Anweshan Desk

মানবাধিকার ডেস্ক

১৬ জুলাই ২০২২, ১৬:৪৫ পিএম


নড়াইলে সাম্প্রদায়িক হামলাঃ হিন্দুদের ৭০টির বেশী বাড়ি-মন্দির-দোকানপাট ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট

নড়াইলের লোহাগড়ায় ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক নবী মোহাম্মদকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি করা হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে গতকাল শুক্রবার (১৫ জুলাই)  স্থানীয় হিন্দু ধর্মালম্বীদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৭০টির বেশি ঘরবাড়ি, মন্দির এবং দোকানপাটে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের শিকার হয়েছে।

 

এরমধ্যে, দিঘুলিয়া এলাকায় হিন্দু ধর্মালম্বীদের মূল মন্দিরসহ ৯টি মন্দির এবং ৯টি বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং দিঘুলিয়া বাজারে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩৭টি দোকান এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ করে ভাঙচুর ও লুটপাট করে উগ্রপন্থী মুসলমান সন্ত্রাসীরা। এছাড়া, সাহাপাড়া এলাকায় হিন্দুদের ১২টি বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায় উগ্রপন্থীরা। 

এর আগে, গত ১৪ জুলাই দিঘলিয়া গ্রামের সাহাপাড়ার অশোক সাহার ছেলে আকাশ সাহা ফেসবুকে মোহাম্মদকে নিয়ে কটূক্তি করেছে বলে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ায় স্থানীয় উগ্রপন্থী মুসলমানদের একটি চক্র। পরের দিন শুক্রবার বিকেলে উগ্রপন্থী মুসলমানরা তৌহীদি জনতার ব্যানারে আকাশ সাহার বাড়িসহ মোট ১২টি ঘর ভাংচুর করে এবং একটি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে দুই রুম বিশিষ্ট টিনের ঘর পুড়ে গেছে। এছাড়া সাহাপাড়ার  মন্দিরে আক্রমণ করে চেয়ার ও সাউন্ডবক্স ভাংচুরসহ ইট ছুঁড়েছে সন্ত্রাসীরা। 

রাতের দিকে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা স্থানীয় হিন্দুদের বাড়িঘর, দোকানপাট এবং মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়।

দিঘলিয়া ইউনিয়নের ৮নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য প্রভাত কুমার ঘোষ বলেন, উত্তেজিত জনতা বাড়িঘরে ভাংচুর ও মন্দিরে হামলা করেছে। কয়েকটি বাড়িতে আগুন দিয়েছে।

নড়াইলের পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী কাজ করছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

পুলিশ পরিদর্শক হারান চন্দ্র  জানান, "ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাসকে ঘিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক তরুণের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বিক্ষুদ্ধ জনতা কয়েকটি হিন্দু বাড়িতে ভাংচুর চালায়। মন্দিরে ইট ছুঁড়ে।তারা একটি বাড়িতে আগুন দেয়। আমরা গিয়ে নিভিয়ে ফেলি এবং ফাঁকা গুলি করে ছত্রভঙ্গ করি।”

ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, যার ফেইসবুক আইডির পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার বাবা অশোক সাহাকে থানায় নেওয়া হয়েছে।

লোহাগড়ার ইউএনও আজগার আলী এক ফেসবুক স্টাটাসে জানান, "ধর্মীয় অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত আকাশের বাবা অশোককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং তার ছেলের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে"।

এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে বলেছে, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নতুন কিছু নয়। এর পূর্বেও আমরা এ ধরনের হামলা দেখেছি, যা অনভিপ্রেত এবং অগ্রহণযোগ্য। ইতোপূর্বে ঘটে যাওয়া একইধরনের অপরাধের দৃশ্যত কোনও বিচার দ্রুততম সময়ে না হওয়ায় অপরাধীরা এ ধরনের অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুততার সাথে এ হামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যকীয়। আসক একই সাথে উক্ত শিক্ষার্থী, তার পরিবার ও এলাকার অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবার ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছে।”

উল্লেখ্য,  গত কয়েক বছর ধরে ইসলাম ধর্ম অবমাননা এবং ধর্মানুভুতিতে আঘাতের গুজব ছড়িয়ে  উগ্রপন্থী ও ধর্মান্ধ মুসলমানদের একটি চক্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী  শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে নির্যাতন,  লাঞ্ছিত, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে।  সংখ্যালঘু অধিকার কর্মীদের অভিযোগ,  বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের ধর্মীয় উগ্রবাদ তোষণের কারণে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

৮৭৯৭ বার পঠিত

মানবাধিকার থেকে আরও


Link copied