পটুয়াখালীতে হিন্দু যুবককে আত্মহত্যার প্ররোচনা, ৪ দিনের মধ্যে গ্রেফতার ৫ আসামীর জামিন

Anweshan Desk

মানবাধিকার ডেস্ক

০৯ জুলাই ২০২২, ১৭:৫৫ পিএম


পটুয়াখালীতে হিন্দু যুবককে আত্মহত্যার প্ররোচনা, ৪ দিনের মধ্যে গ্রেফতার ৫ আসামীর জামিন

পটুয়াখালীর দশমিনায় চাঞ্চল্যকর রমেন ঘরামি আত্মহত্যায় প্ররোচনা মামলায় গ্রেফতার ৫ আসামী আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পেয়েছে। গত ৪ জুলাই দ্রুত জামিন পেয়ে জেল থেকে বের হয়ে আসে আসামীরা।

 

এর আগে ২৮ জুন নারায়ণগঞ্জ থেকে দশমিনা থানার পুলিশ ও র‍্যাব-১১ এর সদস্যদের যৌথ অভিযান চালিয়ে মামলার মূল আসামী নিজামকে গ্রেফতার করে। নিজাম (৪৫) উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব লক্ষ্মীপুর গ্রামের নুরু খানের ছেলে।

পরের দিন বুধবার রাতে (২৯ জুন) পটুয়াখালী শহরের কাঠপট্টি এলাকা থেকে ঐ মামলার বাকি ৪ আসামীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতার অপর আসামীরা হচ্ছেন পটুয়াখালীর সদর উপজেলার পৌর শহরের কাঠপট্টি এলাকার খালেক হাওলাদারের ছেলে বেল্লাল হাওলাদার (২৬), কাদের সিকদারের ছেলে সাইদ সিকদার (২৭), শাহজাহান গাজীর ছেলে শাহেদ (২৮) ও আলতাফ মৃধার ছেলে শাহেদ (২৭)। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে শহিদুল নামে আরো এক যুবককে আটক করে কারাগারে পাঠানো হলেও আদালতের মাধ্যমে জামিনে বের হয়ে এসেছে ৫ আসামী।

পুলিশ জানায়, রমেন ঘরামির সঙ্গে এক নারীর আপত্তিকর অবস্থায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নিজাম খাঁ। সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে টাকা দাবি করেন নিজাম খাঁ ও তার সহযোগীরা। এক পর্যায়ে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে বিষয়টি ভাইরাল হয়।

নারায়ণগঞ্জের র‌্যাব-১১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (আইন) মশিউর রহমান বলেন, ‘রমেন ঘরামি আত্মহত্যার প্ররোচনা ও সহায়তার অভিযোগে দশমিনা থানার একটি মামলা আমাদের কাছে এলে আমরা ছায়া তদন্ত শুরু করি। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করি। একপর্যায়ে গত ২৮ জুন সকাল ১০টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকা থেকে প্রধান আসামি নিজামকে গ্রেপ্তার করতে পারি। ‘গ্রেপ্তারের পর নিজাম সবকিছু স্বীকার করেছেন। এ কাজে আরও যারা জড়িত তাদের নামও বলেছে। পরে নিজামকে পুলিশ পটুয়াখালীর দশমিনা থানায় হস্তান্তর করে।’

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘নিজাম পেশাদার প্রতারক। প্রতারণার মাধ্যমেই মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতেন। ব্ল্যাকমেইল করাই তার প্রধান পেশা।

‘মূলত টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্যই রমেনের সঙ্গে এক নারীর জোরপূর্বক অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখায়। পরে রমেনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রথম দিকে রমেন লজ্জায় দুই লাখ টাকা নিজামকে দিলেও পরে গত যখন ১৯ জুন আরও টাকার জন্য যখন চাপ প্রয়োগ করে। তখনই রমেন বিষ খান।’

তিনি বলেন, ‘একপর্যায়ে কাটাখালী সড়কের ওপর পড়ে গেলে স্থানীয় লোকজন তা ভিডিও করে। ওই সময় রমেন প্রতারণার কথা বলতে বলতে জ্ঞান হারান। তাকে প্রথমে দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

‘রমেনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ধারণকৃত সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।’

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে রমেন বলেছিল, ‘…নিয়া একটা মাইয়ারে দিয়া আমার দুই লক্ষ টাকা নিছে। এহন খালি ফোন দেয়, খালি টাহা দে টাহা দে। আমারে মাইয়াডারে দিয়া জোর কইরা রাস্তায় বইয়া ভিডিও কইরা ছাইড়া দেছে। দহিনদারে বাড়ি দহিনদারে বাড়ি। সেই জন্য আমি বিষ খাইছি।’

দশমিনার থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি মেহেদী হাসান বলেন, এক নারী দিয়ে রমেনের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি তুলতে বাধ্য করে তার প্রতিবেশি নিজাম খাঁ। এর ওই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে নিজাম ও তার সহযোগীরা রমেনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতো। 

মুল আসামী মো. নিজাম খাঁ দশমিনা সদর উপজেলার পূর্বলক্ষিপুর গ্রামের নুরু খায়ের ছেলে এবং নিহত রমেন ঘরামিও নিজামের প্রতিবেশি বলে জানা গেছে। এছাড়াও মুল আসামী  নিজাম খাঁ পটুয়াখালী পৌর সভার পরিচ্ছন্নকর্মী বলে জানা গেছে। এর আগেও নিজামের বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইলিং করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে মেয়েদের সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করতো বলে জানা গেছে।

রমেনের মেঝ ভাই সমেন ঘরামি জানান, সম্প্রতি পটুয়াখালী শহরের শেখ রাসেল শিশুপার্কের পাশে বাণিজ্য মেলা চলার সময়ে তার ভাই রমেনকে দশমিনা থেকে ডেকে নিয়ে আসেন নিজাম। পাশাপাশি বাড়ি থাকায় পূর্ব পরিচিত এবং সম্পর্কের কারণেই নিজামের ডাকে সাড়া দিয়ে পটুয়াখালী আসে রমেন। মেলায় রমেন আসার পর নিজামের পরিচিত কোনো এক মেয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে ভিডিও ধারণ করেন নিজাম। সেই ভিডিও ফেসবুকে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

 মামলায় নিজামের সহযোগী আসামীদের বিরুদ্ধে পটুয়াখালী শহরের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। অন্যতম আসামী কাঠপট্টি এলাকার শাহেদ পটুয়াখালী শহরে বিভিন্ন সময় সন্ত্রাসীমূলক কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছেন। এছাড়া পটুয়াখালী শহরে বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজী, স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাদের টেন্ডারবাজীতে সহযোগীতা করা, কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের শ্লীলতাহানির মত নানান অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে।

                                                 ছবিঃ সন্ত্রাসী বাহিনীর পৃষ্ঠপোষক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা  চানু মিয়া

 স্থানীয়দের অভিযোগ,অভিযুক্ত আসামীদের পটুয়াখালীর কাঠপট্টি এলাকায় এক বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে যার মূল পৃষ্ঠপোষক চানু মিয়া নামক একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। তাঁর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। রমেন ঘরামি আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় নিজামের সহযোগিরা গ্রেফতার হলেও গ্রেফতারের ৪ দিনের মাথায় গত ৪ জুলাই দ্রুত জামিন পেয়ে জেল থেকে বের হয়ে আসে। অভিযোগ রয়েছে, চানু মিয়ার সহযোগিতায় আসামীরা দ্রুত জামিন লাভ করে।  চানু মিয়া স্থানীয় আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে আদালতকে আসামীদের দ্রুত জামিন দিতে বাধ্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আর, এই জামিন করানোর ক্ষেত্রে মোটা অংকের টাকাও হাতিয়ে নিয়েছেন সন্ত্রাসী চানু মিয়া। 

উল্লেখ্য, দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরণের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। সরকার, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের একটি বিশেষ ধর্মের অনুসারীদের তোষণের কারণে ন্যায় বিচার পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভিক্টিমরা। ফলে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা দিনের পর দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে খুব দ্রুতই দেশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু শূন্য হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষক ও বিশ্লেষকরা।

১৮৫২ বার পঠিত


Link copied