ধর্ষণের শিকার নারীর 'টু ফিঙ্গার টেস্ট' নিষিদ্ধ করলো হাইকোর্ট

Anweshan Desk

Anweshan Desk

৩১ অগাস্ট ২০২৩, ০০:৩০ এএম


ধর্ষণের শিকার নারীর 'টু ফিঙ্গার টেস্ট' নিষিদ্ধ করলো হাইকোর্ট

ধর্ষণের শিকার নারীর মেডিক্যাল পরীক্ষায় ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ (দুই আঙুলের মাধ্যমে পরীক্ষা) পদ্ধতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায় প্রদানকারী বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি একেএম সাহিদুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের সইয়ের পর রায়টি প্রকাশিত হয়েছে।

 

বুধবার (৩০ আগস্ট) রিটকারী সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

 

এর আগে ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পরীক্ষা পদ্ধতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে ৮টি নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। সেগুলো হলো:

 

 

১. ধর্ষণের শিকার নারীর ক্ষেত্রে দুই আঙুলের পরীক্ষা অবৈজ্ঞানিক, অনির্ভরযোগ্য এবং অবৈধ। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই আঙুলের পরীক্ষা  নিষিদ্ধ।

 

২. রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হেলথ রেসপনস টু জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স—প্রটোকল টু হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারে প্রটোকলটি সব ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ফিজিশিয়ান—যারা ধর্ষণের শিকার নারীর ডাক্তারি (মেডিকো-লিগ্যাল) পরীক্ষা করেন, পুলিশ কর্মকর্তা—যারা ধর্ষণের মামলার তদন্ত করেন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলার সরকারি প্রসিকিউটর এবং আইনজীবীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।

 

৩. ডাক্তাররা ধর্ষণের শিকার নারীর ডাক্তারি (মেডিকো-লিগ্যাল) পরীক্ষার সনদে ধর্ষণের বিষয়ে মতামত দেবেন, কিন্তু কোনোভাবেই অমর্যাদাকর শব্দ, যেমন- ‘অভ্যাসগতভাবে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত’ ব্যবহার করতে পারবেন না। ধর্ষণের শিকার নারীকে তার অতীতের যৌন সম্পর্ক সম্পর্কে কোনও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন না।

 

৪. ধর্ষণের শিকার নারীর যৌনাঙ্গে কোনও গভীর ক্ষত পরীক্ষার জন্য গাইনি বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে হবে।

 

৫. কোনও শিশু বা কিশোরী মেয়ের ক্ষেত্রে পার স্পেকুলাম এক্সামিনেশন পরীক্ষা করা যাবে না, যদি না কোনও বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন থাকে।

 

৬. বায়ো ম্যানুয়াল পরীক্ষার সঙ্গে দুই আঙুলের পরীক্ষার কোনও সম্পর্ক নেই। এটি একটি গাইনি পরীক্ষা এবং ধর্ষণের শিকার নারীর ক্ষেত্রে এ পরীক্ষা করা যাবে না।

 

৭. ধর্ষণের শিকার নারীর ডাক্তারি (মেডিকো-লিগ্যাল) পরীক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও সেবিকাদের নিয়োগ করতে হবে। এ পরীক্ষার সময়ে সুবিধা অনুযায়ী—নারী পুলিশ, একজন নারী আত্মীয়ের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে এবং সুবিধা অনুযায়ী একজন নারী ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। কর্তব্যরত ডাক্তার এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এ পরীক্ষার ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করবেন।

 

৮. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি নিশ্চিত করবে যে আদালতে ধর্ষণের শিকার নারীকে জিজ্ঞাসাবাদে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে—এমন কোনও প্রশ্ন আইনজীবী করবেন না।

 

এর আগে ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারীপক্ষ নামে ৬টি পৃথক সংগঠন এবং দুজন ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা, এই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন।

 

পরে সেই রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবর রুল জারি করেন। সেখানে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ কেন আইনানুগ কর্তৃত্ব-বহির্ভূত এবং অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচিবকে মেয়ে শিশু ও নারীদের ধর্ষণের পরীক্ষার বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন আদালত। তখন তিন মাসের মধ্যে এই কমিটিকে একটি খসড়া নীতিমালা করে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। এ নির্দেশের পর সরকার ‘হেলথ কেয়ার প্রটোকল’ নামে একটি গাইডলাইন তৈরি করে।

 

এরপর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে মামলাটি রুল শুনানির জন্য আসে। সেই শুনানি শেষে আদালত ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পরীক্ষা পদ্ধতি নিষিদ্ধ করে রায় ঘোষণা করেন।

 

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও শারমিন আক্তার। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এএসএম নাজমুল হক।


Link copied