স্থলবন্দরে বেপরোয়া চাঁদাবাজি : কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

Anweshan Desk

Anweshan Desk

২২ জুলাই ২০২৩, ১৭:১২ পিএম


স্থলবন্দরে বেপরোয়া চাঁদাবাজি : কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

প্রতিটি আমদানি-রপ্তানিতে যথাযথ শুল্ক বা রাজস্ব আদায় সরকারি কর্মকর্তাদের অবশ্য পালনীয় কাজ হলেও বুড়িমারী স্থলবন্দরে ঘটে এর বিপরীতটা। ঘুষ খেয়ে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেন কর্মকর্তারা। এক কর্মকর্তা তো বলেই ফেলেছেন, ‘‌সরকার রাজস্ব পাক আর না পাক, আমরা ঠিকমতো ভাগ না পেলে ফাইল ছাড়ব না।’ সমকালের সরেজমিন অনুসন্ধানী রিপোর্টে এমনই সব তথ্য উঠে আসে।

কর্মকর্তাদের মানসিকতা এ রকম হলে সেখানে দুর্নীতি আর অনিয়ম বাসা বাঁধে। অনিয়মের জালে আটকে বুড়িমারী স্থলবন্দরও স্থবির হয়ে পড়েছে। একই চিত্র ভোমরা স্থলবন্দরের।

এই দুই বন্দর ঘিরে ঘুষের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে। ভারতীয়দের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। চাঁদা না নিলে পণ্যভর্তি ট্রাক নড়তে দেওয়া হয় না। ফলে লেগে থাকে ট্রাকজট। প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার ঘুষ ও চাঁদা দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। আর এসব কারণে দুটি স্থলবন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন আমদানিকারকরা। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় হচ্ছে না রাজস্ব।
 

সিন্ডিকেটের কবজায় ভোমরা

সরেজমিন দেখা যায়, ভারতের ঘোজাডাঙ্গা থেকে সারি সারি ট্রাক ঢুকছে ভোমরায়। জিরো পয়েন্টের কালভার্টের ওপর দুই যুবক ট্রাকচালকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। যুবকরা জানালেন, তারা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টের লোক। আর ভারতের ট্রাকচালকরা ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, গত ১৮ দিন ধরে ভোমরায় পণ্য নিয়ে এলে ট্রাকপ্রতি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ২০০ রুপি করে দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ আমদানিকারকরাও। তবে সমস্যা আরও আছে।

সরেজমিন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে চাঁদাবাজি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার চিত্র পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ঘোজাডাঙ্গা সীমান্তেও বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ ভোমরার ব্যবসায়ীদের। দীর্ঘদিন এসব সমস্যার কারণে ভোমরা বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন আমদানিকারকরা। সে কারণে কমেছে পণ্য আমদানি এবং রাজস্ব আদায়।

ভোমরা স্থলবন্দর আমদানি ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশাররফ হোসেন বলেন, ঘোজাডাঙ্গা রপ্তানি ও আমদানি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন চিঠি দিয়ে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিষয়টি তারা লিখিতভাবে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো সুফল মেলেনি। এ নিয়ে আমদানি-রপ্তানিকারকরা ক্ষুব্ধ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা ভারতের প্রতিটি ট্রাক থেকে কারপাস, জিরো পয়েন্ট ফি, চালান রিসিভ, বন্দর, কার্গো ও লেবার বকশিশের নামে ছয়টি খাতে ৮২০ থেকে ১ হাজার ২০ রুপি আদায় করেন। আর বাংলাদেশি প্রতিটি ট্রাক থেকে ঘোজাডাঙ্গার সিঅ্যান্ডএফ চালান পাস ও লেবার বকশিশ, ইমিগ্রেশন, লাইনম্যান টোল ও পার্কিং নামে চারটি খাতে ১ হাজার ৭০০ টাকা আদায় করে। আমদানি-রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, এই টাকা আদায় অবৈধ। কিন্তু তার পরও বছরের পর বছর ধরেই তা চলছে।

ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী নওশাদ দিলওয়ার রাজু বলেন, তারা কোনো টাকা নেন না। এই টাকা সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারী ও শ্রমিকদের দেওয়া হয়। বন্দরে যানজট নিরসনের জন্য তারা ৩০ জন লাইনম্যান ও ১৭-১৮ জন ঝাড়ুদার নিযুক্ত করেছেন। তাদের বেতন দেন তারা। বরং ভারতের তুলনায় তারা কম টাকা আদায় করেন।

তিনি বলেন, ঘোজাডাঙ্গা সীমান্তে কয়েক মাস আগে ওই দেশের পুলিশ ‘সুবিধা ভেহিকেলস ফ্যাসিলিটেশন সিস্টেম’ নামে ট্রাকের সিরিয়াল প্রথা চালু করে। এই ব্যবস্থার আওতায় আগে ভোমরায় আসা ট্রাকপ্রতি ৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হতো। এক সপ্তাহ আগে তা বৃদ্ধি করে ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। ‘সুবিধা’ ব্যবসায়ীদের অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এত বাড়তি টাকা দিতে হলেও তা নিয়ে আমদানিকারকরা কোনো কথা বলছেন না। মূলত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনে পদ না পাওয়ায় কয়েকজন কথিত আমদানিকারক আমাদের হেয় করার চেষ্টা করছে।

অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাকছুদ খান জানান, এই সিস্টেম বাতিলের জন্য গত ১৪ জুন তারা লিখিতভাবে ঘোজাডাঙ্গা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কার্গো ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে জানিয়েছেন। এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ভারতের দূতাবাসে জানানোর প্রস্তুতি চলছে।

আমদানিকারক দীপংকর ঘোষ জানান, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও হলুদ প্রভৃতি আমদানি করতে ঘোজাডাঙ্গায় ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। এটা অন্য কোনো স্থলবন্দরে নেই।

ভোমরা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ৩১ লাখ ৭৫ হাজার টন পণ্য আমদানি হয়। সদ্য সমাপ্ত ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ লাখ ৯ হাজার টনে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় ৭৪২ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৩২ কোটি টাকায়।

এ ব্যাপারে ভোমরা স্থলবন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার সমকালকে বলেন, চাঁদা আদায় হয় বন্দর কর্তৃপক্ষের এলাকার বাইরে এবং এটি ব্যবসায়ীদের নিজস্ব ব্যাপার। এখানে তাদের কিছুই করার নেই।

ট্রাকের দীর্ঘ জট ও ভোগান্তি

সরেজমিন দেখা যায়, বন্দরে ঢোকার প্রায় এক কিলোমিটার আগে থেকে খালি ও পণ্যবোঝাই ট্রাকের দীর্ঘ সারি। ট্রাকচালক বিল্লাল হোসেন বলেন, তিনি সকাল ১০টায় এখানে এসে জটে পড়েছেন। এখন বিকেল সাড়ে ৩টা বাজে, এখনও বন্দর ইয়ার্ডে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। ট্রাকে পেঁয়াজ বোঝাই করতে পারলে তা নিয়ে চট্টগ্রামে যাবেন। অন্য কোনো স্থলবন্দরে এমন যানজট দেখেননি। ভোমরা ইমিগ্রেশন দিয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য আসা কয়েকজন যাত্রী জানান, যানজটের কারণে ব্যাগ নিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে ইমিগ্রেশনে আসতে হয়েছে। এর ফলে দুর্ভোগ হয়েছে।

‘স্পিডমানি’ ছাড়া ফাইল নড়ে না বুড়িমারীতে

চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটে জিম্মি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর। ফলে দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীরা এ বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বিদেশ গমনকারীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

২০১০ সালে এ শুল্ক স্টেশনটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করা হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গতা পায়নি।ভাড়া করা ভবনে কার্যক্রম চালাতে হয়। উত্তরাঞ্চলের একমাত্র এই বন্দরটির সঙ্গে বাংলাদেশের ত্রিদেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্য হয়ে থাকে। এই পথে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, ভুটান ও নেপালের ব্যবসা হয়। তাই বন্দরটি মূলত ত্রিদেশীয় বন্দর হিসেবে স্বীকৃত।

স্থলবন্দরটি প্রতিষ্ঠার পর হতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের একটি সিন্ডিকেট নিজেদের মর্জিমাফিক ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছে। আর এখন কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, আমদানি-রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে চলছে রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব। তাই সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। স্বাভাবিক কারণেই প্রতিবছর রাজস্ব আদায়ের অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না।

একাধিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অভিযোগ করে বলেন, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ঘুষ না দিলে দিনের পর দিন পড়ে থাকে ট্রাক। তাই ভুক্তভোগীরা এই বন্দর আর ব্যবহার করতে চান না।

বুড়িমারীর সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সায়েদুজ্জামান বলেন, দিনের পর দিন হয়রানিতে আমরা অতিষ্ঠ। সরকারের রাজস্ব আদায় বেশি হয় এমন পণ্য (ইমিটেশন, কাপড়, মসলা, জিরা, চা পাতা, মোটর পার্টস, ইলেকট্রিক সরঞ্জাম) এই বন্দর দিয়ে নিয়ে এলেই খুলে যায় কাস্টমসের হয়রানির খাতা। যাচাই-বাছাইয়ের নামে তারা মালপত্র ফেলে রাখে দীর্ঘ সময়। আবার চাহিদামতো ১ থেকে ২ লাখ টাকা ঘুষ দিলে ফাইল দৌড়ায় বিদ্যুৎ গতিতে। কাস্টসম সুপারিনটেনডেন্ট থেকে শুরু করে ইন্সপেক্টর পর্যায়ের কর্মকর্তা এই অনৈতিক কাজের সঙ্গে বেশি জড়িত। আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানালে একজন কর্মকর্তা সরাসরিই বলে দেন, ‘‌রাজস্ব যা আদায় হয় হোক, আমরা ঠিকমতো ভাগ না পেলে ফাইল ছাড়া হবে না।’

তবে এই বন্দরের কাস্টসমের ডেপুটি কমিশনার আব্দুল আলিম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের একটি অংশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অনৈতিক কাজ করে থাকে। তিনি স্বীকার করেন, তাঁর অধীনস্থ কিছু কর্মকর্তা ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে সুবিধা নেয়। এটা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বুড়িমারী স্থলবন্দর ও ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা স্থলবন্দরে যৌথ শক্তিশালী আন্তঃদেশীয় একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

প্রথমে একটি আমদানিকৃত পণ্যের ট্রাক বুড়িমারী স্থলবন্দরে প্রবেশের পর বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ হয়ে নির্ধারিত ওজন স্টেশনে নেওয়া হয়। সেখানে কম্পিউটার পদ্ধতির মাধ্যমে ওজন পরীক্ষা করা হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী ওজন স্টেশনে গুল্ক গোয়েন্দা, কাস্টমস, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ও আমদানিকারকের প্রতিনিধি হিসেবে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লোকজন উপস্থিত থাকে। এখানেই সমঝোতার ভিত্তিতে পূর্বপরিকল্পনায় আমদানি করা পণ্যের ওজন ফাঁকি দিয়ে কম দেখানো হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই অতিরিক্ত পণ্যের রাজস্ব ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া হয়।

আমদানি-রপ্তানি পণ্যের দ্রুত ছাড়পত্র নেওয়া ও হয়রানি থেকে রেহাই পেতে আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে অতিরিক্ত টাকা ঘুষ দেন। তাদের ভাষায়, একে ‘স্পিড মানি’ বলা হয়।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৪৬ লাখ টনের বেশি পণ্য, রপ্তানি হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার টন; ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৩৩ লাখ ৯১ হাজার টন, রপ্তানি হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার টন পণ্য।

তবে এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি প্রতিবছর বাড়লেও শুল্ক বিভাগ রাজস্ব আদায়ে তাদের টার্গেট পূরণ করতে পারছে না। ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১৩৭ কোটি টাকা থাকলেও আদায় হয় ৯১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৩১ কোটি ৮২ লাখ এবং আদায় হয়েছে ৯৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

পণ্যবাহী ট্রাকের জট

স্থান সংকুলান না হওয়ায় এই বন্দরে সব সময়ই পণ্যবাহী ট্রাকের জট দেখা যায়। বন্দরের মধ্যে বেশ কিছু অংশের মাটি ডেবে গর্ত সৃষ্টি হলে সেগুলো এখন মেরামত করা হচ্ছে। বাকি জায়গায় ট্রাকের বহর লেগেই থাকে। আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা জানান, জায়গা নেই তবুও দ্রুত গাড়ি ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয় না। পণ্য খালাসের অভাবে গাড়িগুলো সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে পড়ে থাকে।

বুড়িমারী স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্দরে তিনটি গুদামের ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৮০০ টন। গুদামগুলো বেশির ভাগ সময়ই পণ্যভর্তি হয়ে থাকে।

ভারত থেকে ভুট্টা নিয়ে আসা ট্রাকচালক সুকুমার বলেন, এক সপ্তাহ হতে চলল বন্দরে আটকা পড়ে আছি। কবে মালপত্র ছাড় হবে তাও বলতে পারছি না। এতে করে আমরা আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ছি। কেউ এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনাও দিচ্ছে না। বুড়িমারী স্থলবন্দরের কাস্টমস সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম বলেন, দেরিতে পণ্য খালাসের কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।

পদে পদে হয়রানি চাঁদাবাজি

স্থলবন্দর দিয়ে পাসপোর্টধারী যেসব যাত্রী ভারত, ভুটান ও নেপাল থেকে নৈশকোচে বাংলাদেশে আসেন, সেসব যাত্রীর লাগেজ তল্লাশির নামে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে। এখন ভারতে যেতে পাসপোর্টপ্রতি পুলিশের নামে দালালদের দিতে হয় ৩০০-৫০০ টাকা। নগদ টাকা থাকলে তার একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন নিয়ে নেয় তারা।

আবার আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত ট্রাকগুলো থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের নামে তোলা এই চাঁদা নেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাহাজুল ইসলাম মিঠু। তবে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, আমি নিজে এ কাজে জড়িত নই। আমার নাম ভেঙে অন্য কেউ এই কাজ করতে পারে।

অন্যদিকে, বুড়িমারী স্থলবন্দরের চাঁদাবাজির আরও একটি বড় খাত হলো ওজন স্টেশন। এখানে পণ্যভেদে প্রতি ট্রাক থেকে ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হয়। পরিদর্শন কালে দেখা গেছে, বন্দরের তিনটি ওজন পরিমাপক মেশিন থাকলেও চাঁদাবাজির সুবিধার জন্য দুটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এক মেশিনে পরিমাপকালে স্বাভাবিক কারণেই ভিড় লেগে যায়। হয়রানি এড়াতে তখন টাকা দিয়ে পরিমাপ কাজ শেষ করতে হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এই বন্দরে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ ট্রাক প্রবেশ করে। সেই হিসাবে প্রতিদিন অন্তত আড়াই লক্ষাধিক টাকা চাঁদা ওঠে।

স্থলবন্দর পরিদর্শক মাসুদ হোসেন ও ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশরাফুল হক টাকা আদায়ের কথা স্বীকার করে জানান, অল্প কিছু অর্থ নেওয়া হয়। তবে এই টাকা অফিসাররা কেউ ভাগ নেন না। সেখানে যারা কাজ করে, তারাই এই টাকা নিয়ে থাকে। বুড়িমারী স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক গিয়াস উদ্দিন জানান, চাঁদাবাজরা তাদের কেউ নন। তারা বহিরাগত। বন্দরের বাইরে একটি চক্র এই কাজ করে।


Link copied