সালাম না নেয়ার অভিযোগ তুলে 'ধর্ম অবমাননার গুজব' আতঙ্কে স্কুল শিক্ষিকা

Anweshan Desk

সংখ্যালঘু নির্যাতন ডেস্ক

২৭ অগাস্ট ২০২২, ০২:১৪ এএম


সালাম না নেয়ার অভিযোগ তুলে 'ধর্ম অবমাননার গুজব' আতঙ্কে স্কুল শিক্ষিকা

কুষ্টিয়ায় শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার গুজব

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় শিক্ষার্থীদের সালাম না নিয়ে কটুক্তি করেছেন বলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সনাতন ধর্মালম্বী এক নারী শিক্ষকের উপর হামলা চালানোর চেষ্টা করে একদল উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। পরবর্তীতে পুলিশ ধর্ম অবমাননার কোনো সত্যতা মেলেনি বলে জানায়। এদিকে নারী শিক্ষকের উপর ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদের দ্বারা হামলার চেষ্টার সময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ডাকে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ঐ নারী শিক্ষককে উদ্ধার করে হেফাজতে নিয়ে যায় পুলিশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল।

গত বুধবার ভেড়ামারা উপজেলার মোকারিমপুর ইউনিয়নের দামুকদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জয়ত্রী রানী সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কয়েক ঘন্টা ধরে বিক্ষোভ ও হামলা চালানোর চেষ্টা চালায় উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যাদের মধ্যে ঐ বিদ্যালয়ের কিছু উগ্রবাদী শিক্ষার্থীও বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে জানায় ওসি মুজিবর রহমান৷

কিন্তু ধর্ম অবমাননার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঐ শিক্ষিকা। স্কুল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনও বলছে, কোনো উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে শিক্ষিকার নামে ধর্ম অবমাননার গুজব রটিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা চালাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রচার করা হচ্ছে উস্কানিমূলক বক্তব্য। 

এদিকে আতঙ্কে গৃহবন্দী হয়ে পড়েছেন ঐ শিক্ষিকা।

পুলিশ বলছে, তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহনের কথা জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। আর এই ঘটনার উপর শনিবার বিকেলে পরিচালনা কমিটির বৈঠক হবার কথা জানিয়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

প্রধান শিক্ষক মুমিনুল হক আরো বলেন, 'ঘটনার শুরু গত সপ্তাহ থেকে।' সেদিন ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক ছাত্রকে শ্রেণিকক্ষে স্কেল দিয়ে মারার অভিযোগ ওঠে৷ 

'সেদিন অষ্টম শ্রেণির ক্লাসে দুই ছাত্রী পাথর ছোড়াছুড়ি করছিলো। এমন সময় পিছন থেকে এক ছাত্র ম্যাডামকে বারবার ডাকছিলো। ম্যাডাম ভেবেছিলেন ঐ ছাত্রই পাথর ছুড়ছিলেন। তিনি তাকে শাসন করতে গিয়ে স্কেল দিয়ে দুটো বারি দেন৷ তবে পরে ছেলেটি আমাকে জানায় সে পাথর ছুড়েনি৷ 

পরদিন শিক্ষার্থীর মা বাবা সহ স্কুলে আসেন। আমরা বিষয়টা মিমাংসা করে দিই। ম্যাডাম তার ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়ে নেন। অভিভাবকরা বিষয়টি নিয়ে আর তেমন কোনো অভিযোগ করেননি।

প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘এরপর বুধবার সকালে যথারীতি স্কুল শুরু হয়। ১০টা ২০ মিনিটে অ্যাসেম্বলি শেষের পর শিক্ষার্থীরা ক্লাসে চলে যায়। ক্লাস শুরুর পর হঠাৎ অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে, ওই শিক্ষক ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন।

‘অষ্টম শ্রেণির ছাত্ররা ক্লাস নাইন-টেনের ছাত্রদের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করে বলে পরে শুনেছি। ছাত্ররা এই অভিযোগ শুরুর পরই কিছু বহিরাগত স্কুলে ঢুকে পড়ে। তারা ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করে, শিক্ষক ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন।’

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বহিরাগত একদল লোক ফেইসবুকে শিক্ষিকা জয়ত্রী রানীর বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কটুক্তি করার অভিযোগ এনে পোস্ট দেয়। এবং পরবর্তীতে প্রথমে পাঁচ-সাতজন বহিরাগত স্কুলে এসে প্রবেশ করে। তারা এই শিক্ষার্থীদের এলাকার বড় ভাই বা স্থানীয় হতে পারে। একপর্যায়ে তাদের স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়। কিছুক্ষণ পর তারা ৫০ জনের মতো লোক নিয়ে  স্কুলের সীমানা প্রাচীর টপকে আবার স্কুলে প্রবেশ করে। এরপর ছাত্ররা তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে এবং ঐ শিক্ষিকার উপর হামলা চালানোর চেষ্টা করে৷

যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই শিক্ষিকা কবে বা কীভাবে ধর্ম অবমাননা করেছেন, সে বিষয়ে বিক্ষোভকারীদের বক্তব্যে প্রচুর অসংগতি এবং ভিত্তিহীন তথ্য ছিল বলে জানান প্রধান শিক্ষক।

তিনি বলেন, ‘কেউ বলে ম্যাডাম ধর্ম নিয়ে অনেক আগে কটূক্তি করেছে। কেউ বলছে ১৫ দিন আগে, কেউ বলছে রোজার মধ্যে বলেছে। কিন্তু কেউ নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারে নি। আমাদের ধারণা, এক শিক্ষার্থীকে স্কেল দিয়ে আঘাতের ঘটনার পর এ বিষয়টি ছড়ানো হয়েছে।

‘আমরা ওই শিক্ষককে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি জানিয়েছেন, কখনও ধর্ম নিয়ে কোনো কটূক্তি করেননি।’

বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় প্রশাসনকে খবর দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ।

প্রধান শিক্ষক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ইউএনও, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে খবর দিই। এরপর পুলিশ এসে ওই শিক্ষককে নিরাপত্তা দিয়ে স্কুল থেকে নিয়ে যায়।’

বিক্ষোভকারীরা প্রধান শিক্ষকের বাড়িতেও হামলা করে। মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুলের পাশেই আমার বাড়ি। পুলিশ এসে ছেলেমেয়েদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর তারা আমার বাড়িতেও হামলা করে। ইটপাটকেল ছোড়ে।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্কুল পরিচালনা কমিটির নির্দেশে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। শনিবার বিকেল ৪টায় স্কুল পরিচালনা কমিটির বৈঠকে বাকি সব সিদ্ধান্ত হবে। রোববার স্কুল খুলবে কি না, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন হবে কি না, সে ব্যাপারে আলোচনা হবে।’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দামুকদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষী খায়রুল ইসলাম বলেন, আসলে ঘটল এক ঘটনা, আর সেটাকে বানিয়ে ফেলল অন্য ঘটনা। কিছুই বুঝতে পারলাম না। ঘটনার সূত্রপাত হলো মেয়েদের গায়ে পাথরকুচি ছোড়া নিয়ে। সেই ঘটনায় ম্যাডাম মারধর করল এক ছাত্রকে। মার খাওয়া ওই ছাত্র ক্লাশ থেকে বেরিয়ে গিয়ে বহিরাগত কিছু লোকজন নিয়ে এসে আজগুবি এক অভিযোগ দাঁড় করাল বলে খায়রুলের অভিযোগ।

বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে  কথা বললে দশম শ্রেণির এক ছাত্র অভিযোগ করে, ‘১৫-২০ দিন আগে আমাদের ক্লাসের সামনে দিয়ে ম্যাডাম আসছিলেন। আমি ম্যাডামকে সালাম দিই। উনি বলেন, সালাম আমাকে না দিয়ে অন্য কাউকে দিও।’

এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষককে কোনো অভিযোগ করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে রাহুল বলে, ‘প্রধান শিক্ষককে জানাইনি। এর কয়দিন পর শুনলাম ক্লাস এইটে গিয়েও ম্যাডাম একই কথা বলেছেন। তাই আমরা একসঙ্গে এর প্রতিবাদ করার চিন্তা করি।’

নবম শ্রেণির এক ছাত্রের অভিযোগ, ‘আমি ক্লাসের মধ্যে দুই মাস আগে ম্যাডামকে সালাম দিই। তিনি সালাম নেননি।’

এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষককে জানানো হয়েছে বলে দাবি করছে ছাত্ররা। তবে এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘এমন কেনো অভিযোগ আমি পাইনি।’

ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে রয়েছেন ওই নারী শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আমার কারও সঙ্গে বিরোধ নেই। কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করিনি। ক্লাসে পাথর ছোড়াছুড়ির কারণে এক শিক্ষার্থীকে ভুলক্রমে আঘাত করেছিলাম। এতে আমারই ভুল ছিল। তবে তার অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান হয়েছে। আমি ক্ষমা চেয়েছি। তবে এরপর নতুন করে ইসলামবিরোধী কথা বলার অভিযোগ এনে উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাকে সালাম দিলে আমি সব সময় উত্তর দিই। ধর্ম অবমাননাকর কিছু আমি কখনই বলিনি।’

স্কুল থেকে উদ্ধারের পরের ঘটনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন আমাকে নিরাপত্তা দিয়ে থানায় আনে। পরে রাতে বাড়ি ফিরি। আমি আতঙ্কে আছি। এ ধরনের ষড়যন্ত্র আবারও হতে পারে।’

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনা একটা ষড়যন্ত্র। এটা ম্যাডামের প্রতি ক্ষোভ থেকে করা হয়েছে। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে এগুলো করা হয়ে থাকতে পারে। আমি প্রতিটি ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞাসা করেছি। তারা নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেনি।

‘কোনো অভিভাবককেও কোনো ছাত্র আগে থেকে কোনো অভিযোগ করেনি। কোনো অভিভাবক এসেও আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেনি। হঠাৎ করে বুধবার তারা এসব কথা বলেছে।’

তিনি বলেন, ‘স্কুলে জড়ো হওয়া বহিরাগতরা আমার এলাকার। এরা স্কুলে পড়াশোনা করে না। আমার মনে হচ্ছে এরা উগ্রবাদী সংগঠন জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা নারায় তাকবির আল্লাহু আকবর বলে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। দেয়াল টপকে স্কুলে আসে। তাদের এই শিক্ষকের সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ থাকতে পারে। তিনি হিন্দু এই জন্যই তার সঙ্গে এটা করা হয়েছে বলে আমি মনে করছি।’

ভেড়ামারা থানার ওসি মুজিবর রহমান বলেন, জয়ত্রী রানী সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মকে কটূক্তি বা অবমাননাকর কথা বলেছে বলে যে অভিযোগ তুলে যারা বিভিন্ন ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ও ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে উস্কানী সৃষ্টি করেছে তাদের ইতোমধ্যে পুলিশের সাইবার শাখা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক উস্কানিদাতা ইতোমধ্যে নিজেদের ভুল স্বীকার করে তাদের পোস্ট ডিলিট করে দিয়েছে। কিন্তু পুলিশ কর্তৃক গুজব রটনাকারীদের কাউকে গ্রেফতার করা হয় নি।

ওসি মুজিবর রহমান আরো বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমাদের মনে হয়েছে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। রিউমার ছড়িয়ে কেউ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে কোনো সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেছে। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে।’

সর্বশেষ ওসি বলেন, বিষয়টি খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পুলিশ। সেই সাথে ওই বিদ্যালয়সহ আক্রান্ত শিক্ষিকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সব রকম উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

৪৯৭৬ বার পঠিত

ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন থেকে আরও


Link copied